নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | 8 বার পঠিত

আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। হাতির বিলুপ্তি রোধ, আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর এ দিনটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।’
বাংলাদেশে হাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, বন দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও হাতির চলাচলের করিডর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বন্যহাতি। এতে একদিকে যেমন ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে হাতি-মানুষের সংঘাত।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আবদুর রহমান একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চালাতেন। ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে বছরে তিন-চারবার জোয়ারের পানিতে তাঁর ঘরবাড়ি ডুবে যেত। ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে দুই বছর আগে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েন তিনি। স্থান বদলের সঙ্গে বদলেছে পেশাও। এখন বননির্ভর কাজ করেই ছয় সদস্যের পরিবারের জীবিকা চলছে।
একইভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পশ্চিম বড়ঘোনার মনসুর আলমও চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েছেন। পূর্ব জঙ্গল চাম্বল অংশেই বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০টি পরিবারের বসবাস বলে স্থানীয়দের দাবি। শুধু চাম্বল নয়, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর অংশেও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে।
এতে সংকুচিত হচ্ছে হাতির আবাসস্থল। বন দখল করে বসতি ও চাষাবাদ করায় হাতির খাদ্যযোগ্য গাছপালা কমে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হাতির প্রথাগত চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’। ফলে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতির পাল।
স্থানীয় হাবিবুল্লাহ বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করলেও আগে হাতির আতঙ্ক ছিল না। কয়েক বছর ধরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত সপ্তাহেও রাতে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট করেছে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ফজল কাদের বলেন, হাতি লোকালয়ে এলে শিস দিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়। পরে আগুন জ্বালিয়ে হাতির পালকে গহিন বনের দিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, সংরক্ষিত বন ও লোকালয় ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বনের জমিতে বসতি স্থাপন করায় হাতি-মানুষের সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েছে। হাতির আবাসস্থল রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরির উদ্যোগও চলছে।
বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী মনিরা পারভিন বলেন, কয়েক বছর ধরে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব বাড়ছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের ফলে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়েছে। এভাবে পাহাড়ে মানুষের পুনর্বাসন চলতে থাকলে হাতির সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, হাতির আবাসস্থল হলো বনাঞ্চল। বনের পরিবেশের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসবে। হাতিকে রক্ষা করতে নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রায় ১৯ হাজার একর আয়তনের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বড় একটি অংশ বাঁশখালী উপজেলায়। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতি চলাচলের করিডর হিসেবে পরিচিত।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১০২টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশেই মারা গেছে ১৪টি হাতি।
বিশ্বব্যাপী হাতি ‘বিপন্ন’ হলেও বাংলাদেশে এশীয় হাতি ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) হাতিকে লাল তালিকাভুক্ত করে।
বন অধিদপ্তর ও আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, হাতি-মানুষের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বা এলিফ্যান্ট করিডর ধ্বংস হওয়া। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পাহাড় কেটে বসতি এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে হাতির আবাসস্থল।
বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ও বিচরণক্ষেত্র জানতে এ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে তিনটি জরিপ হয়েছে—১৯৮০, ২০০০ ও ২০১৬ সালে।
বন বিভাগের প্রথম জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ৩৮০টি। ২০০০ সালের জরিপে পাওয়া যায় ২৩৯টি হাতি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জরিপে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৮টিতে।
অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ে হাতির সংখ্যা কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়েনি। বরং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্যসংকট ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে প্রজাতিটির অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
শেরপুরের গারো পাহাড়ে অবশ্য হাতির সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে। বনাঞ্চলে অবাধে গাছ কাটা, বালু-পাথর উত্তোলন, বন দখল করে বসতি স্থাপন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডার কমে গেলেও সেখানে হাতির বংশবিস্তার ঘটছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে গারো পাহাড়ে অন্তত ৫৫টি হাতির শাবক জন্মেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে এই এলাকায় ১০০ থেকে ১২০টি হাতির বিচরণ দেখা গেলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ড্রোন ক্যামেরায় বনের ভেতর ৩৪টি হাতির একটি পাল দেখা যায়। ওই পালে ৮ থেকে ১০টি শাবক ছিল বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। হাতির বিভিন্ন পালে ছোট-বড় শাবকের উপস্থিতিও তাদের বংশবিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে খাবারের সংকটের কারণে হাতি প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে। ফলে হাতির সংখ্যা বাড়লেও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বালিজুরি রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান তৈরির কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাতি হত্যারোধ বা লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ঠেকালেই সমস্যার সমাধান হবে না। হাতির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা, করিডরগুলো দখলমুক্ত রাখা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা এবং সংরক্ষিত বনে অবৈধ বসতি ও বন উজাড় বন্ধ করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
হাতির আবাসস্থল রক্ষা করা গেলে শুধু একটি বিপন্ন প্রজাতিই নয়, একই সঙ্গে রক্ষা পাবে বন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য। আর সেই বার্তাই সামনে রেখে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস।
Posted ২:২৬ এএম | বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।